জার্মানির সাত গোলে বিশ্বকাপে একদিনে চার ম্যাচে ১৯ গোল!

Unknown
প্রকাশ :

জার্মানির সাত গোলে বিশ্বকাপে একদিনে চার ম্যাচে ১৯ গোল!


খেলা ডেস্ক।।  এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। গোলের পর গোল। এত গোল বিশ্বকাপের এক দিনে হয়েছে কি না সন্দেহ। বাংলাদেশ সময় রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত চার ম্যাচে মোট ১৯ গোল হল। বড় জয় পেল জার্মানি, সুইডেন। ড্র হল নেদারল্যান্ডস বনাম জাপান ম্যাচ। জিতল আইভরি কোস্টও।


দুধের শিশু কুরাসাওকে ৭ গোল জার্মানির

শেষ বার বিশ্বকাপে জার্মানি ৭-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতেছিল ১২ বছর আগে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আয়োজক ব্রাজ়িলকে এই ব্যবধানেই হারিয়েছিল তারা। একই ফলাফল ফিরল এ বারের বিশ্বকাপে। হিউস্টনে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারাল জার্মানি। ১২ বছর পর ‘বন্ধু’ পেল ব্রাজ়িল।


এক লক্ষ ৫৬ হাজার। পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে এর চেয়ে ঢের বেশি ভোটার মিলবে। ঠিক এটাই জনসংখ্যা কুরাসাওয়ের। স্বপ্নের যোগ্যতা অর্জন পর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল তারা। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি হতে হল। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ৯ নম্বর এবং চার বারের বিশ্বজয়ী জার্মানির বিরুদ্ধে ম্যাচ যে সহজ হবে না এটা অতি বড় কুরাসাও সমর্থকও বুঝতে পেরেছিলেন। তবে সাত গোল খেতে হবে এটা অনেকেই ভাবতে পারেননি। এত গোল হজম করার পরেও কুরাসাওকে একটি মুহূর্তের জন্যও নেতিবাচক ফুটবল খেলতে দেখা যায়নি। বল পেলেই তারা প্রতি আক্রমণে উঠে গোল করার চেষ্টা করেছে।


ম্যাচের শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যায় জার্মানি। ৬ মিনিটে গোল করেন ফেলিক্স মেচা। ফ্লোরিয়ান উইর্ৎজ়ের থেকে পাস পেয়ে মেচা নিখুঁত শটে গোল করেন। তখন মনে করা হয়েছিল, জার্মানি সহজেই ম্যাচ পকেটে পুরে নেবে। কিন্তু নাটক তখনও শুরু হয়নি। ২১ মিনিটে গোল শোধ করে দেন লিভানো কমেনেন্সিয়া। কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাসে যা প্রথম গোল। প্রতি আক্রমণ থেকে যে ভাবে গোল করেন কমেনেন্সিয়া, তা প্রশংসা করার মতোই।


ওটাই ছিল জার্মানদের স্বভিমানে আঘাত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওই একটা গোল হজম জার্মানির খেলার মেজাজটাই বদলে দিল। বাকি যে সময়টা খেলা হল, তাতে দাপট শুধু জার্মানির। বল নিয়ন্ত্রণ, শট, আগ্রাসন— সবেতেই এগিয়ে থেকেছে তারা। সাতটি গোলের মধ্যে ছ’জন আলাদা স্কোরার। এতেই বোঝা গিয়েছে জার্মানি কতটা দলগত খেলা উপহার দিয়েছে।


তবে প্রশংসা করতেই হবে কুরাসাওকে। তারা দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে। কিন্তু এক ফোঁটাও লড়াই ছাড়েনি। জনসংখ্যার বিচারে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসাবে বিশ্বকাপে খেলতে নেমে আগেই ইতিহাস তৈরি করেছিল তারা। এ দিন প্রমাণ করেছে, জনসংখ্যা যতই কম হোক, মাঠে যে ১১ জন নামবেন, তাঁরা জীবন দিয়ে খেলবেন।





ম্যাচের প্রথম কোয়ার্টারের পর থেকেই জার্মানি এবং কুরাসাওয়ের ফুটবলের গুণমানের অভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। জার্মানি ছেলেখেলা করতে থাকে কুরাসাওয়ের রক্ষণ নিয়ে। ইচ্ছেমতো তারা আক্রমণ করেছে, গোল করেছে। কিন্তু কুরাসাওয়ের মনোবল তুবড়ে দিতে পারেনি।


বড় দলের বিরুদ্ধে ছোট কোনও দল খেলতে নামলে সাধারণত ঘর সামলানোর দিকেই নজর দেয় বেশি। কুরাসাও যে আলাদা কিছু করেছে তা নয়। কিন্তু অতি রক্ষণাত্মক ফুটবল বা নেতিবাচক ফুটবলের রাস্তায় তারা হাঁটেনি। বল পেলে উড়িয়ে দেওয়ার নীতি নয়, তারা চেষ্টা করেছে পাস খেলে, লম্বা বল খেলে, হিসেবে ফুটবল খেলে আক্রমণে উঠতে। দুই দলের ফুটবলারের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ফারাকের কারণে তারা সফল হয়নি। কিন্তু লড়াইয়ের রাস্তা থেকে সরে আসেনি। দিনের শেষে এটাই কুরাসাওয়ের বড় প্রাপ্তি।


পিছিয়ে পড়েও নেদারল্যান্ডসকে রুখল জাপান

রবিবার নেদারল্যান্ডস বনাম জাপান ম্যাচের প্রথমার্ধে ঘুমপাড়ানি ফুটবল চলছিল। দুই দলের খেলায় না ছিল তাগিদ, না ছিল আগ্রাসন। দ্বিতীয়ার্ধে সেই দুই দলের খেলাই আমূল বদলে গেল। খেলায় গতি এল, প্রাণ ফিরে পেল ম্যাচ। দেখা গেল লড়াকু, আগ্রাসী জাপানকে। এশিয়ার দল রুখে দিল নেদারল্যান্ডসকে। শেষ মুহূ্র্তের করা গোলে ২-২ ড্র হল ম্যাচ।


তিন মিনিটের মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল নেদারল্যান্ডস। কিন্তু ডনিয়েল মালেনের শট বারের উপর দিয়ে উড়ে যায়। এর পর থেকে দু’দলের খেলায় শুধু ঘুমপাড়ানি ফুটবল। নেদারল্যান্ডস যতটা পারছিল নিজেদের মধ্যে পাস খেলছিল। চেষ্টা করছিল বলের দখল রাখার। কিন্তু গোলের সুযোগ সে ভাবে তৈরিই হচ্ছিল না। বরং তারা মাঝে মাঝে শারীরিক ফুটবলে জাপানকে বেগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল, যার কোনও দরকারই ছিল না। যে কয়েকটি সুযোগ তারা তৈরি করেছিল তা রুখে দেন জাপানের গোলকিপার জ়িয়ন সুজ়ুকি।


সাম্প্রতিক অতীতে ইংল্যান্ড, ব্রাজ়িলের মতো দেশকে হারিয়েছে জাপান। গত বারের বিশ্বকাপে হারিয়েছে জার্মানির মতো দলকে। সেই দলের এমন নিষ্প্রভ ফুটবল দেখে অবাক হয়েছিলেন সমর্থকেরা। জাপান মানেই আগ্রাসী ফুটবল, প্রতি আক্রমণে ঝড় তুলে দেওয়া খেলা। কিন্তু এ দিন প্রথমার্ধে জাপানকে দেখে মনে হচ্ছিল খেলার ইচ্ছেই নেই তাদের। কোনও মতে জোর করে মাঠে নামানো হয়েছে। চোটের কারণে তাকুমি মিনামিনো, কাওরু মিতোমারা না থাকায় এমনিতেই তারা একটু দুর্বল। তা বলে লড়াইটুকু দেখা যাবে না, এটা অনেকেই প্রত্যাশা করেননি।


দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের খেলাই বদলে গেল। শুরুটা হয় নেদারল্যান্ডসকে দিয়ে। সেটাও জাপানের রক্ষণের ভুলে। ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রস যখন ভার্জিল ভ্যান ডাইক হেড করছেন, তখন জাপানের কোনও খেলোয়াড় তাঁকে মার্ক করেননি। কার্যত ফাঁকায় গোল করে যান নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক। তখনও জাপান স্বমূর্তি ধারণ করেনি।


তা হল সাত মিনিট পর। তাকেফুসা কুবো নেদারল্যান্ডসের বক্সে ঢুকে পাস দিয়েছিলেন কিতো নাকামুরাকে। তিনি বল ধরে সামান্য এগিয়ে নিচু শটে পরাস্ত করেন বার্ট ভারব্রুগেনকে। নাকামুরার এক সতীর্থ অফসাইডে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর পায়ে হালকা স্পর্শ লেগে বল গোলে ঢোকে। যদি রেফারি অফসাইড দেননি।


কয়েক মিনিট পরে আবার এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। এ বার গোল করেন ক্রিসেন্সিয়ো সামারভিল। তাঁর গোল আসে অনেকটা আর্জেন রবেনের কায়দায়। জাপানের বক্সে ঢুকে বাঁ দিকে কাট করে বিপক্ষের ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁ পায়ের নিচু শটে গোল করেন তিনি। জাপানের গোলকিপারের কিছু করারই ছিল না।


খেলা শেষ হতে তখন দু’মিনিট বাকি। মনে হচ্ছিল তিন পয়েন্ট নিয়েই ফিরবে নেদারল্যান্ডস। তা হতে দিলেন না কোকি ওগাওয়া। তাঁর শট দাইচি কামাদার গায়ে লেগে গোলে ঢুকে যায়। পিছিয়েও পড়েও ডালাসে এক পয়েন্ট ছিনিয়ে নেয় জাপান।


টিউনিশিয়াকে মাটি ধরাল সুইডেন

সুইডেনের খেলা দেখে মনে হল, এ বারের বিশ্বকাপের কালো ঘোড়া তারা। গত বার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি পোল্যান্ডের কাছে হেরে। এ বার সেই পোল্যান্ডকে হারিয়েই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে তারা। প্রথম ম্যাচেই সুইডেন বুঝিয়ে দিল, তাদেক হালকা ভাবে নিলে ভুগতে হবে।


পাঁচ গোল করলেও অন্তত সাত গোল করার সুযোগ পেয়েছিল সুইজেন। শুরুটা ইয়াসিন আইয়ারির পায়ে। চাইলে টিউনিশিয়ার হয়েও খেলতে পারতেন আইয়ারি। তিনি বেছে নেন সুইডেন। ৭ মিনিটের মাথায় গোল করে তাই উল্লাস করেননি এই স্ট্রাইকার। ৩০ মিনিটে একক দক্ষতায় ব্যবধান বাড়া আলেকজ়ান্ডার ইসাক। বিরতির ঠিক আগে ওমার রেকিক টিউনিশিয়ার হয়ে এক গোল শোধ করেন।


দ্বিতীয়ার্ধে শুধুই সুইডেনের আক্রমণ। ৫৯ মিনিটের মাথায় দলের তৃতীয় গোল করেন ভিক্টর গয়কেরেস। পরিবর্ত হিসাবে নেমে প্রথম টাচেই গোল মাটিয়াস সোয়ানবার্গের। গোলের শুরুটা করেছিলেন আইয়ারি। শেষটাও করেন তিনি। সংযুক্তি সময়ে দূরপাল্লার শটে দেখার মতো গোল করেন এই স্ট্রাইকার।


জাপান ও নেদারল্যান্ডস ড্র করায় এই গ্রুপ থেকে আপাতত শীর্ষে সুইডেন। তারা যে খেলাটা দেখাল, তাতে জাপান ও নেদারল্যান্ডসের সামনেও কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে।


ইকুয়েডরকে হারাল আইভরি কোস্ট

বাকি তিন ম্যাচে ১৮ গোল হলেও এই ম্যাচে মাত্র এক গোল হল। তা-ও একেবারে শেষ মুহূর্তে। দেখে মনে হচ্ছিল, ড্র হবে খেলা। কিন্তু ৯০ মিনিটের মাথায় আমাদ দিয়ালোর গোলে জেতে আইভরি কোস্ট। হারতে হল লাতিন আমেরিকার দল ইকুয়েডরকে।





উল্লেখ্য, ১১ জুন থেকে শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ। চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। এ বারই প্রথম ৪৮টি দেশকে নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে ফিফা। ফুটবল বিশ্বকাপ হচ্ছে তিনটি দেশে। আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকো বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক। তিনটি দেশে আলাদা আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে ফিফা।


বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হয়েছে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে। ১১ জুন মেক্সিকোর বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ।